অড়হর বাংলাদেশের পরিচিত একটি ডালজাতীয় ফসল। সাধারণত রাস্তার পাশে, বসতভিটার আশেপাশে এবং গ্রামীণ পরিবেশে এর চাষ হতে দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই এটি খাদ্য ও কৃষিকাজের সহায়ক ফসল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অড়হর চাষ হয়ে থাকে, বিশেষ করে কুষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর এবং যশোর অঞ্চলে এর চাষ বেশি দেখা যায়। অড়হর গাছ সাধারণত ফলন দিতে প্রায় ৩০০ দিন সময় নেয়। এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বর্ষা শুরুর আগে বীজ বপন করা হয় এবং ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের দিকে এর ফল পাকে।
ইংরেজিতে অড়হরকে Pigeon Pea বলা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাষ হলেও কুষ্টিয়া, রংপুর, দিনাজপুর ও যশোর অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
অড়হরের খাদ্য ও ব্যবহারিক গুরুত্ব
অড়হরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুমুখী খাদ্য ব্যবহার। কচি সবুজ বীজ সবজি হিসেবে খাওয়া যায়, আর শুকনো বীজ ডাল হিসেবে রান্না করা হয়। ফলে একই ফসল থেকে সবজি ও ডাল—দুই ধরনের খাদ্য পাওয়া সম্ভব।
শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবেই নয়, পশুখাদ্য হিসেবেও অড়হর গুরুত্বপূর্ণ। ফলসহ গাছের ডগা গরু ও ছাগলের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এজন্য অনেক কৃষক এটিকে মিশ্র কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে চাষ করেন।
অড়হরের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি ছাউনি বা বায়ুরোধক ফসল হিসেবে কাজ করতে পারে। বাতাসের গতি কমিয়ে অন্যান্য ফসলকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এছাড়া সবুজ সার হিসেবেও এর ব্যবহার রয়েছে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সহায়ক।
অড়হর গাছের বৈশিষ্ট্য
অড়হর গাছ সাধারণত ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং গাছ ঝোপালো ও ডালপালাযুক্ত হয়। এর শিকড় মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করতে পারে, ফলে খরা পরিস্থিতিতেও এটি তুলনামূলক ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত আর্দ্র বা পানি জমে থাকা মাটি অড়হর চাষের জন্য উপযুক্ত নয়।
অড়হর চাষ পদ্ধতি
অড়হর চাষের জন্য জমি খুব বেশি প্রস্তুত করার প্রয়োজন হয় না। সাধারণত ১–২ বার চাষ ও মই দিলেই যথেষ্ট। তবে জমি সমান করে নেওয়া ভালো। রাস্তার পাশে বা পতিত জমিতে চাষ করলে মাটি কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হয়।
অড়হরের জন্য অতিরিক্ত সারের প্রয়োজন তুলনামূলক কম। ভালো ফলনের জন্য এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত বীজ বপন সবচেয়ে উপযোগী।
যেহেতু গাছ বড় ও বিস্তৃত হয়, তাই সারি করে বপন করা সুবিধাজনক। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২–২.৫ মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব প্রায় ২ মিটার রাখা উচিত। প্রতি গর্তে ২–৩টি বীজ বপন করা হয় এবং পরে একটি সবল গাছ রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলা হয়।
চারা তৈরি করেও অড়হর চাষ করা যায়। পলিব্যাগে চারা তৈরি করে ২০–২৫ দিন বয়সে জমিতে রোপণ করা সম্ভব।
সেচ ও পানি নিষ্কাশন
বীজ বপনের সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে হালকা সেচ দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে অড়হর বৃষ্টিনির্ভর ফসল এবং অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয় না।
অড়হর গাছ পানি জমে থাকা সহ্য করতে পারে না। তাই জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে শিকড় পচে গাছ মারা যেতে পারে।
পরিচর্যা
শুরুর দিকে অড়হরের বৃদ্ধি ধীরগতির হয়। এ সময়ে আগাছা পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত ৩০–৪০ দিন পর্যন্ত আগাছা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।
ছোট গাছগুলোকে খুঁটি দিয়ে বেঁধে দিলে ঝড়ো বাতাস বা অতিবৃষ্টিতে হেলে পড়ার ঝুঁকি কমে।
ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
বীজ বপনের প্রায় ২৫০–২৬০ দিন পর অড়হর পরিপক্ব হয়। তবে সবজি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঁচা পড পরিপক্ব হওয়ার প্রায় ৩০–৪০ দিন আগেই সংগ্রহ করা যায়।
পরিপক্ব হওয়ার পর পডসহ ডাল কেটে আঁটি বেঁধে রোদে শুকানো হয়। পরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বা যান্ত্রিকভাবে মাড়াই করে বীজ আলাদা করা হয়।
সংগ্রহ করা বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে ৮–৯ শতাংশ আর্দ্রতায় বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করতে হয়। বেশি পরিমাণ বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুঁড়ি পোকার আক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফলন
অড়হরের গড় ফলন প্রতি হেক্টরে প্রায় ১.৫–১.৮ টন ডাল পাওয়া যায়। অনুকূল আবহাওয়া ও যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে ফলন হেক্টরপ্রতি ২ টন পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি জ্বালানি কাঠ হিসেবেও ২–২.৫ টন পর্যন্ত উৎপাদন পাওয়া সম্ভব।
পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা
অড়হরে প্রধানত ফুল ও ফল ছিদ্রকারী পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, থ্রিপস, জাবপোকা এবং বিভিন্ন বাগজাতীয় পোকার আক্রমণ দেখা যেতে পারে। এসব পোকা পাতা খাওয়ার পাশাপাশি পড ক্ষতিগ্রস্ত করে বীজের ক্ষতি করে।
রোগের মধ্যে গোড়া পচা, ঢলে পড়া এবং মরিচা রোগ দেখা দিতে পারে। বীজ বপনের আগে বীজ শোধন করলে রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সাধারণত বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।